Skip to content

গ্লোবাল মিথেন প্লেজে বাংলাদেশ যোগ দিলেও গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ হচ্ছে না

গ্লোবাল মিথেন প্লেজে বাংলাদেশ যোগ দিলেও গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ হচ্ছে না

বেনার নিউজ

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে বহুগুণ ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত মিথেন গ্যাস নিঃসরণ বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন গ্লোবাল মিথেন প্লেজে যোগ দিলেও এই গ্যাসের পরিমাণ কমানোর উদ্যোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ।

মিথেন নিঃসরণের সাথে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ও প্রাণী সম্পদ খাত সরাসরি জড়িত থাকায় আন্তর্জাতিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা ছাড়া এই গ্যাসের পরিমাণ কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশে উৎপাদিত মিথেন গ্যাসের অর্ধেক বর্জ্য থেকে এবং বাকি অর্ধেক ধান চাষ ও গবাদিপশুর খামার থেকে আসে বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লাইমেট চেঞ্জ সেলের পরিচালক মির্জা শওকত আলী।

“ধান ক্ষেতে বেশিদিন ধরে পানি জমে থাকলে সেখানে বেশি পরিমাণ মিথেন উৎপাদিত হয়,” জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন “আমাদের কৃষক ভাইদের একটি ধারণা জমিতে সবসময় পানি না থাকলে ফলন ভালো হয় না। সেকারণে আমাদের দেশে এক কেজি চাল উৎপাদনে তিন হাজার লিটার পানি প্রয়োজন হয়।”

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) শতকরা সাড়ে ১১ ভাগ আসে কৃষি থেকে এবং এই খাতের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষ জড়িত।

মির্জা শওকত আলী জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ক্লাইমেট অ্যান্ড ক্লিন এয়ার কোয়ালিশনের (সিসিএসি) প্রতিষ্ঠাতা আটটি দেশের একটি, যার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিশ্বে মিথেন নিঃসরণ কমানো। গত অক্টোবরে মন্ত্রিসভায় সিসিএসি-তে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

তিনি বলেন, “আমরাও মিথেন কমাতে চাই,” তবে মিথেন উৎপাদনের বাংলাদেশের “খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র জড়িত,” ফলে “আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা না পাওয়া গেলে আমরা মিথেন কমাতে পারব না।”

“এটা কমানো আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে নেই,” বলেন মির্জা শওকত আলী।

এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক উৎস থেকে মিথেন কমানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ তেমন কোনো সহায়তার প্রতিশ্রুতি পায়নি বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, “কিছু সংস্থা এক লাখ, দুই লাখ ডলার সাহায্য দিতে চায়, যেগুলো গবেষণায় ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু আমাদের এখন গবেষণার পরিবর্তে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি মিথেন কমানোর ব্যাপারে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন, যা সরাসরি দরিদ্র মানুষসহ সবার উপকারে আসবে।”

‘সহায়তা না পেলে মিথেন কমানো সম্ভব নয়’

ভালো ফসলের আশায় বাংলাদেশি কৃষকরা জমিতে পানি জমিয়ে রাখলেও শওকত আলী বলেন, “আমরা গবেষণা থেকে দেখেছি, ভালো ফলনের জন্য ধান ক্ষেতে সবসময় পানি থাকার প্রয়োজন হয় না।”

“ধানে ফুল আসার পর দানা গঠনের সময় বেশি পানি প্রয়োজন হয়। অন্য সময় নিয়মিত পানি না দিলেও উৎপাদনে হেরফের হয় না,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “এ কারণে কৃষি গবেষকরা অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই পদ্ধতিতে পানির ব্যবহার অনেক কম হয়। ক্ষেত সবসময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে না। ফলে মিথেন উৎপাদন কমে আসে।”

মিথেন কমানো প্রাধান্য না হওয়ার পরও কেন সরকার গ্লোবাল মিথেন প্লেজে যোগ দিয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লাইমেট চেঞ্জ সেলের উপপরিচালক (আন্তর্জাতিক কনভেনশন) হারুন-অর-রশীদ বেনারকে বলেন, “এই উদ্যোগে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার অন্যতম কারণ হলো, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া।”

“এই দুই ধরনের সহায়তা না পাওয়া গেলে মিথেন উৎপাদন কমানো সম্ভব নয়,” বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ও স্বল্প মেয়াদী দুষিত পদার্থ দায়ী। কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য স্বল্পমেয়াদী কিছু দূষিত পদার্থ রয়েছে যেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব অনেক বেশি। এগুলো বায়ুমণ্ডলে বেশি দিন থাকে না। স্বল্প আয়ুষ্কালের পদার্থের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন, মিথেন ও ট্রপোস্ফরিক ওজোন।

২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রণীত বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর রিডিউসিং শর্ট লিভড ক্লাইমেট পলিউট্যান্টস (এসএলসিপিস) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনেপ)-ওয়ার্ল্ড মেটিওরলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের মতে, স্বল্পমেয়াদী দূষিত পদার্থের দূষণ রোধ করা গেলে বিশ্বে ২৪ লাখ অকাল মৃত্যু রোধ করা যাবে, পাঁচ কোটি ২০ লাখ টন কৃষি উৎপাদন রক্ষা করা যাবে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা আধা ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো যাবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের হিসাবে স্বল্পমেয়াদী দূষিত পদার্থের দূষণের কারণে এক লাখ ছয় হাজার অকাল মৃত্যু হয়েছে।

মিথেন অনেক বেশি ক্ষতিকর

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বেনারকে বলেন, গ্লোবাল মিথেন প্লেজ এ যোগদান বাংলাদেশের একটি ভালো সিদ্ধান্ত।

তিনি বলেন, “কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে মিথেন অনেক বেশি ক্ষতিকর। এই গ্যাসের পরিমাণ কমাতে হবে।”

“আমাদের দেশে মিথেন উৎপাদনের পরিমাণ কমানো সম্ভব। কিছু কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে সব খাত থেকে মিথেনের পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে,” যোগ করেন সাবের হোসেন চৌধুরী।

২০১৮ সালের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে ঢাকা শহরে উৎপন্ন হয় সাড়ে ৬ হাজার টন।

এই বর্জ্যের বেশিরভাগই শহরাঞ্চলের বিভিন্ন ফাঁকা স্থানে ফেলা দেয়া হয়, যেগুলো ল্যান্ডফিল বা বর্জ্যভূমি নামে পরিচিত। ফেলা দেয়া এসব বর্জ্য থেকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। ঢাকা শহরের মাতুয়াইল ও আমিনবাজারে দুটি ল্যান্ডফিল স্টেশন রয়েছে।

গত বছর এপ্রিলে কানাডার মন্ট্রিল ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জিএইচজিস্যাট জানিয়েছে, ঢাকার মাতুয়াইলের ভাগাড় থেকে প্রতি ঘণ্টায় চার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদন হয়। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তারা ঘণ্টায় এত পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন অসম্ভব বলে দাবি করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর উপপরিচালক মিজান আর. খান বেনারকে বলেন, গ্লোবাল মিথেন প্লেজ উদ্যোগে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ এবং বিশ্ব দুই-ই উপকৃত হবে।

তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই নগণ্য, যাকে আমরা বলি ন্যানো এমিটার। বাংলাদেশের দূষণ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে তেমন প্রভাব ফেলে না। এরপরও বাংলাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে এমিশন কমাতে রাজি হয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সাথে রয়েছে, যা প্রশংসা করার মতো।”

তবে “কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া না গেলে বাংলাদেশে মিথেন উৎপাদন বন্ধ করা যাবে না জানিয়ে ড. মিজান বলেন, “কৃষকদের কারিগরি ও প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য দিতে হবে যাতে তারা ধান খেতে পানি বেশিদিন আবদ্ধ না করে রাখে। শুধু মিথেন নিঃসরণ কমানোর কথা বললেই তারা পানির ব্যবহার কমাবে না।”

“একইভাবে, আমাদের গবাদিপশুর খামারে উৎপাদিত কঠিন ও তরল বর্জ্যগুলো ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে বায়োগ্যাস ও প্রাকৃতিক সার উৎপাদন করতে হবে,” বলেন ড. মিজান।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবির বেনারকে বলেন, “ধান ক্ষেত থেকে মিথেন উৎপাদন হয় সেটি ঠিক, কিন্তু ধান গাছ আবার কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নেয়। এটিও ভুলে গেলে চলবে না।”