Skip to content

গণপ্রতিরোধ প্রয়োজন

শারদীয় দুর্গাপূজা নিয়ে কটূক্তি করে সম্প্রতি আলোচনায় আসেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহার।

গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লায় পূজার প্রস্তুতি উপলক্ষে এক সভায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ‘মদমুক্ত’ পূজা উদযাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, পূজা চলাকালে মদ খেয়ে নাচানাচি বন্ধ করতে হবে। এ সময় মণ্ডপে ‘মাদকমুক্ত পূজা’ লিখে দেবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার এমন মন্তব্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

কয়েকদিন আগে সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসকে ‘মালাউন’ বলে গালি দেন মুন্সীগঞ্জের মেয়র ফয়সাল বিপ্লব। এরপর কুড়িগ্রামের চারণ কবি রাধাপদ রায়ের ওপর ঘটে নির্মম হামলার ঘটনা। রাধাপদকে হামলার সময় দুর্বৃত্তরা বলেছে ‘হেঁদু মারলে কিছু হয় না’। আমাদের সমাজ সংস্কৃতির অধঃপতন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এসব ঘটনা থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আরও দুঃখের বিষয় এই যে, এ নিয়ে আমরা আমাদের নাগরিক সমাজকে সেই অর্থে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখিনি। প্রতিবাদ যা করার, তা করছে খোদ ভুক্তভোগীরাই।

সাম্প্রদায়িক গালাগাল, আ ক ম বাহাউদ্দিনের দুর্গাপূজাকে কটাক্ষ করে মন্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় পূজার প্রাক্কালে মন্দিরে হামলা এবং ভাঙচুরের প্রতিবাদে শুক্রবার কুমিল্লায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিল হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। এ প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছিলেন এমপি বাহার। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঐক্য পরিষদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের সমর্থক, মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হন। তাদের মধ্যে একজনের মাথা ফেটে যায়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই।

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। আমাদের সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৫২ বছরের ইতিহাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, সে হোক ধর্মীয় কিংবা নৃতাত্ত্বিক; ক্রমাগত হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। বিগত ৫২ বছরের ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক, ভাষাগত বা চেতনাগত প্রগতিশীল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের খতিয়ান আমরা কম-বেশি সবাই জানি। একাত্তরের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করেছে, এটা আমাদের কারও অজানা নয়। ১৬ ডিসেম্বরের পরে শরণার্থী হিন্দুর এক বড় অংশ সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরে আসেননি। সর্বস্ব খোয়ানো দেশে ফিরে আসা হিন্দুর সংখ্যা তাই বলে নেহায়েত কম নয়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস, উচ্ছ্বাস আর আস্থা নিয়েই তাদের ফিরে আসা। অথচ সেই বাংলাদেশে সব সরকারের আমলেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অব্যাহতভাবে। অধিকাংশই নীরবে দেশ ছেড়েছেন চাপা সন্ত্রাসের মুখে।

রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেলে যে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়, সেটি আমরা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আমলে দেখেছি। আবার সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীর লোকজন—কেউ পিছিয়ে নেই। ‘সংখ্যালঘুবান্ধব’ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে একনাগাড়ে প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় আছে। এই সময়েও যে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন-হয়রানি বন্ধ হয়নি, তার প্রমাণ রামু, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ, সাঁথিয়া, দিনাজপুর এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। তাই আমরা মনে করি, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিহত করতে সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।



বার্তা সূত্র