Skip to content

ক্ষোভ-অসন্তোষ বুকে নিয়েই হাসিনায় আস্থা সংখ্যালঘুদের PM Sheikh Hasina To Hindu Community In Bangladesh

অমল সরকর, ঢাকা

‘এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না (Bangladesh)। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন খুশিতে ভরে উঠবে, এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে, এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের, যারা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে।’

সল্টলেকে বাংলাদেশ উপদূতাবাসের ভিসা অফিসের ঘরের দেওয়ালে লেখা শেখ মুজিবুর রহমানের এই কথাগুলি মনে পড়ে গেল দিন কয়েক আগে, ঢাকায় শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের অফিস ঘরের আলোচনায়। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জেএল ভৌমিক, চন্দ্রনাথ পোদ্দার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজল দেবনাথ, সাংবাদিক সন্তোষ শর্মা, বাসুদেব ধর, মণীন্দ্রকুমার নাথ, মিলনকান্তি দত্ত, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি ও বাংলাদেশ স্বাধীনতা ফাউন্ডেশনের নারায়ণ সাহা মণিদের কথার নির্যাস হল— আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। এই দেশ আমাদের। আমরা আমাদের দেশকে ভালবাসি।

কলকাতা এবং গুয়াহাটির সাংবাদিকদের সদ্য অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সফরের সূচিতে প্রথমেই ছিল ঢাকায় সে দেশের হিন্দুদের প্রধান তীর্থক্ষেত্র ঢাকেশ্বরী মন্দির দর্শন। সেখানেই ব্যবস্থা হয়েছিল ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি বৈঠকের ব্যবস্থা।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সুদীর্ঘ ইতিহাস, নানা ঘাত-প্রতিঘাত, ঘটনা-দুর্ঘটনার কথা মন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়েই বলছিলেন কর্তাব্যক্তিরা। সমস্যার একটি হল, মন্দিরের বেহাত হয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার। তাঁরাই জানালেন, এই কাজে সংখ্যালঘুদের একমাত্র এবং শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে অনেকটা জমি পুনরুদ্ধার করে দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। প্রতি বছর দুর্গাপুজোয় প্রধানমন্ত্রী মন্দিরে আসেন।

আরও পড়ুন: ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’-তে ফল উপচে পড়লে যা হয়

ঘটনাচক্রে আমাদের আলাপচারিতার পর দিনই ছিল ঢাকায় বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গোটা তিরিশ সংগঠনের যৌথ কর্মসূচি ‘চলো চলো ঢাকায় চলো।’ রাজধানীর শাহবাগ চত্বরের জমায়েত শেষে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচির মূল স্লোগান ছিল, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ আলোচনায় সে প্রসঙ্গ উঠল। দাবিপত্রে প্রধান দাবিটি বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতির জন্য খুবই স্পর্শকাতর ছিল সন্দেহ নেই। সংগঠনগুলির অভিযোগ, পরের ভোটের আর এক বছর বাকি। আওয়ামী লিগ সরকার আগের ভোটে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ করেনি।

Image - ক্ষোভ-অসন্তোষ বুকে নিয়েই হাসিনায় আস্থা সংখ্যালঘুদের

আশ্চর্য হলাম, এমন অভিযোগের পর সফররত সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করার আগেই উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করে দিলেন, দাবি পূরণ না হলেও ক্ষোভ, অসন্তোষ, যন্ত্রণা, অভিমান বুকে চেপে তাঁরা অপেক্ষা করবেন। কোনও অবস্থাতেই শেখ হাসিনার পাশ থেকে সরে যাবেন না। কারণ?

এক, তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। দুই, তাঁরা বিশ্বাস করেন, এই নারী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে রক্ষার প্রধান কাণ্ডারি। আর সেই চেতনার মধ্যেই বেঁচে আছে এই দেশে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এবং দেশের জন্য আত্মবলিদানের অনন্য ইতিহাস। অফিসের দেওয়ালে জ্বল জ্বল করছে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম চিত্তরঞ্জন দত্তের ছবি। সিআর দত্ত নামেই যিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি।

Image - ক্ষোভ-অসন্তোষ বুকে নিয়েই হাসিনায় আস্থা সংখ্যালঘুদের
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম খেতাব প্রাপ্ত প্রয়াত চিত্তরঞ্জন দত্ত।

শেখ মুজিবুর রহমানের চালু বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি মুছে দিয়েছিলেন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা তথা সেনা শাসক জিয়াউর রহমান। কয়েক কদম এগিয়ে আর এক সেনা শাসক হুসেইন মহম্মদ এরশাদ ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা করে শব্দটি সংবিধানে ঢুকিয়ে দেন। জিয়া পত্নী খালেদাকে হটিয়ে হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ফিরিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ইসলামই। বিচিত্র সমাপতন।

ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম হওয়াই কি বাংলাদেশে ইসলামিক মৌলবাদের বাড়বাড়ন্তের প্রধান কারণ? বলাই যায়, সেই সব মানুষ এবং তাদের বংশধরেরা অবশ্যই উল্লসিত, যারা ১৯৭০-এর সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনেও শেখ মুজিবুর ও আওয়ামী লিগের বিরোধিতা করেছিল। যে নির্বাচনকে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির গণভোট বলেছিলেন। আর সেই ছয় দফাই ছিল স্বাধীনতা অর্জনের প্রাথমিক সোপান।

বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলে থাকা সেই ঐতিহাসিক ভোটেও পূর্ববঙ্গের ২৮ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লিগকে সমর্থন করেনি। তারা ছিল পাকিস্তানের পক্ষের শক্তি। অর্থাৎ ভাষার ভিত্তিতে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র চায়নি। বলাইবাহুল্য, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর তাঁরা পাকিস্তানে চলে যাননি। ফলে সংখ্যালঘুর স্বার্থহানি, তাদের অধিকার হরণে উল্লসিত হওয়ার মতো মানুষেরা দিব্য আছেন মুজিবুরের দেশে।

২০০১-এ বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের ঘটনাগুলিকে ফিরে দেখলে আজও মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনার অত্যাচারের ছবিগুলি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বলছিলেন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আমাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। একদা ঢাকায় কর্মরত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তা বলছিলেন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এখনও আছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য আলাদা। বিএনপি আমলে ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে হিন্দুদের দেশছাড়া করার চেষ্টা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে যাদের অবদান সংখ্যাগুরুর তুলনায় কিছুমাত্র কম নয়। এখনকার হামলাগুলির লক্ষ্য সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল।

ঘটনা একটিতে থেমে থাকেনি। গত বছরের দুর্গাপুজোর আয়োজন তাই ছিল ভিন্ন রকম। প্রতিটি প্যান্ডেল ছিল পুলিশ পরিবৃত। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আলোচনায় স্বাভাবিক ভাবেই কেউ কেউ ন্যায্য প্রশ্নটি তুললেন, কেন পুলিশ পরিবৃত হয়ে পুজো করতে হবে আমাদের? দু’বছর আগে দুর্গাপুজোয় বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে হামলার ঘটনাগুলি ছিল ‘অত্যন্ত সুপরিকল্পিত’, বলেছিলেন সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ পুলিশ শতাধিক অভিযোগে কয়েক হাজার জ্ঞাত-অজ্ঞাতের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছে। ধরাও পড়েছে মূল অভিযুক্ত।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে নিছকই আইন-শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে সম্ভবত ঐতিহাসিক ভুল হয়ে যাবে। একই সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়া ভাল, এমন গভীর সঙ্কটের দায় শুধুমাত্র বাংলাদেশ এবং তার জনগণের উপরে চাপিয়ে দেওয়াও হবে কালীদাসি মন-মানসিকতার লালন পালন। পররাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারি, আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে পারি, কিন্তু নাক গলাতে পারি না। তবে নিজের ভাল চেয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নিতে পারি।

এই উপমহাদেশে আজ যা সবচেয়ে বিপন্ন, বঙ্গবন্ধু তাঁর মাত্র ৫৪ বছরের জীবনে সেই ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথাই সবচেয়ে বেশি বলে গিয়েছেন। একেবারে নীতিপাঠ দেওয়ার মতো করে, সময় সুযোগ পেলেই তিনি এই কথাটি সহযোদ্ধাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন। দুর্ভাগ্যের, তাঁরই জন্ম-শতবর্ষে, তাঁরই হাতে সৃষ্ট দেশটির সুবর্ণজয়ন্তী বছরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি থেকে স্পষ্ট, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের উপর হামলার উদ্দেশ্যে ধর্ম অবমাননার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। যাকে বলে বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যে বারুদ জড়ো করা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অবসরপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান কুমিল্লায় পুজো মণ্ডপে হামলার ঘটনার পর এক নিবন্ধে দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৬৪-তে কাশ্মীরের হজরত-বাল মসজিদ ঘিরে বিবাদের ঘটনাকে হাতিয়ার করে পাকিস্তানের পশ্চিমি শাসকেরা পূর্ব-পাকিস্তানে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে ভেস্তে দিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে কসুর করেনি। সে দিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, ফরিদপুরে আওয়াজ উঠেছিল, পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও।’ সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ স্লোগানটিকে স্মরণ রেখে সমস্বরে জোরালো কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও’ উচ্চারিত হলে দু’পারেরই মঙ্গল হত।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের হল, বাংলাদেশে সম্প্রীতি রক্ষার নাগরিক আয়োজনগুলিও আজ আর প্রতিরোধহীন নয়। বিভেদকামীরা সমান সক্রিয়। তারই মধ্যে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা তথা ওই সংগঠনের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সদস্য সচিব বাংলাদেশের জনপ্রিয় লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের মতো মানুষেরা। করোনাকালে ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাঁরা নিয়মিত সম্প্রীতির চর্চায় আবদ্ধ রেখেছেন দেশে-বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের। তাঁরা চেষ্টা করছেন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগরণ ঘটাতে, যার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পাঠ। কারণ, ধর্ম নির্বিশেষে অসহিষ্ণুদের বেশির ভাগই কিশোর, তরুণ। মনোজগতে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য এই বয়সকাল অত্যন্ত উপযোগী।

বাংলাদেশে আজকের রাজনীতিকদের বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছিলেন তরুণ। পাক সেনার হাতে ন’মাস গৃহবন্দি ছিলেন সদ্য মা হওয়া বছর চব্বিশের তরুণী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধের মূল সঙ্কল্পটি ছিল, বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষা। সেই বাঙালিকে আজ হিন্দু ও মুসলিমে ভাগ করার জোরালো চেষ্টার শাখা-প্রশাখা কতটা পল্লবিত হয়েছে, তার আঁচ পাওয়া গিয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে। তাই হয়তো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা চিন্তিত, বিচলিত। অবস্থা ফেরাতে চাই বাঙালির সংস্কৃতির আরও জোরদার অনুশীলন। ইদ, দুর্গাপুজো, বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন সেই অনুশীলনেরই অংশ।

এই প্রসঙ্গেই বলি, বছর দু’য়েক আগে ঢাকায় ছায়ানটের অনুষ্ঠান-সহ সে দেশে নববর্ষ উদ্‌যাপনের নাগরিক উদ্যোগগুলি দেখার পর বাঙালি হিসাবে গর্ববোধ করার পাশাপাশি খানিক গ্লানি বোধ হয়েছিল এ-পারে একই ভাষাভাষি আমরা কেন সমান উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনে মাততে পারি না!

মুজিবের দেশের আর এক সমস্যা এই সেদিন পর্যন্ত অনেকটাই নিজেদের ভুলে বেশিরভাগ বিরোধী দল শীতঘুমে ছিল। হালে তারা রাজপথে নেমেছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মনে রাখা দরকার, বিরোধী দল ময়দানে না থাকলেও সরকারের বিরোধিতা তাতে থমকে থাকে না। শূন্যতা পূরণে বিরোধী স্বরের অভিভাবক হয়ে ওঠে বিভেদকামী, ধর্মান্ধ শক্তি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার আসল অস্ত্র গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল। তাই গণতান্ত্রিক পরিসরকে প্রসারিত করা আশু কর্তব্য।

সাম্প্রতিক ঘটনাকে হাতিয়ার করে শুধু বাংলাদেশের প্রতি জ্ঞানবর্ষণ নিছকই ছেলেমানুষি বাহাদুরি করা হবে। সে দেশে সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে এ-পারে যাঁরা সীমান্তে গিয়ে শুয়ে পড়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, তাঁদের খেয়াল রাখা দরকার, নিজের দেশে তাঁরা সংখ্যালঘুদের প্রতি কেমন আচরণ করেন। এ দেশে সংখ্যালঘুদের আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক–সব কিছুকেই আজ পদে পদে নিশানা করা হচ্ছে।

এ আলোচনাও তাই প্রাসঙ্গিক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিগত পঞ্চাশ বছরের শেষ তিরিশ বছরে তার প্রধান প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি কোন খাতে বয়েছে। সদ্য বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ, ভারত ও পাকিস্তান পঁচাত্তর পূর্ণ করেছে। ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপমহাদেশের তিন দেশই অভাবনীয় সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বিদ্বেষ, বিভাজনে জর্জরিত। বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী ভারতের ঘটনাবলি, হিন্দুত্ববাদীদের দাপাদাপি, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের আপস, আত্মসমর্পণ, সংখ্যালঘু নিপীড়নের ক্রমবর্ধমান ঘটনা এবং তাতে রাষ্ট্রের চোখ-কান-মুখ বুজে থাকায়, গোটা উপমহাদেশেই অস্থিরতা বাড়ছে। অন্য দিকে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দাপটের মুখে একের পর এক পুতুল সরকার যেমন দেশটিকে আর্থিক দিক থেকে দেউলিয়া করে তুলেছে, তেমনই বিপন্নতার শিকার সংখ্যালঘুরা।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আলাপচারিতায় ঢাকার আইনজীবী তাপস পাল বলছিলেন, ‘ভারতে কোনও রকম সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলেই তার প্রভাব, প্রতিক্রিয়া এসে পড়ে বাংলাদেশে।’

এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বোধ হয় পথ চলতে হবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার ভাষণেই বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তাঁরা আমাদের ভাই। তাঁদের রক্ষার ভার আমার আপনার উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ঢাকায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারীদের মুখে শুনলাম, তাঁরা নিঃসংশয়, বঙ্গবন্ধুর ওই কথাটি বুকে ধারণ করেন শেখ হাসিনা।



বার্তা সূত্র