ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক জনশুমারি

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক জনশুমারি

জনশুমারি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, এটা তাদের প্রতি করুণা নয়— ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক জনশুমারি। সঠিক পরিসংখ্যান না পেলে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ওয়েবিনারের বক্তারা।

বুধবার (০৯ ডিসেম্বর) ‘সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা: জনসংখ্যা ও আবাসন আদমশুমারি ২০২১’ শীর্ষক এ ওয়েবিনার যোৗথভাবে আয়োজন করে দৈনিক কালের কণ্ঠ ও হেক্স/কেপার।

ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প নিয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরী ও হাজং জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীরা পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ পাবেন। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক কাজ করেছে সরকার। টাকার বরাদ্দও বাড়ানো যাবে।

তিনি বলেন, আমরা দলিত শব্দের সঙ্গে পরিচিত নই। আমরা সেই শব্দও বলি না। আমরা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বলি। দলিত শব্দ সাংস্কৃতিকভাবেও অসম্মানজনক, আমরা এটা বলি না। যেমন এখন আমরা আদমশুমারি বলি না, জনশুমারি বলি।

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সবাইকে জনশুমারির আওতায় নিয়ে আসা হবে। এটা বড় কোনো জনগোষ্ঠী নয়, সেটা করা যাবে। পরিসংখ্যান বিভাগে খোঁজ নেব। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জনশুমারি করতে যা প্রয়োজন, তা করা হবে।

তিনি বলেন, আপনি নরওয়েতে যান, সেখানেও এমন জনগোষ্ঠী পাবেন। আমরা বাংলাদেশে সেটা চাই না। সরকারি চাকরিতে কোটার কথা বলছেন অনেকে, কিছু দিন আগে আমি একটা হাসপাতালে কোভিড-১৯ চিকিৎসা নেই। তখন একজন ডাক্তার চিকিৎসা দেন। তাকে জিজ্ঞেস করি, তোমার বাড়ি কী মৌলভীবাজার?  মনে হলো মণিপুরী সম্প্রদায়ের। পরে তিনি বললেন বাড়ি রাজশাহী। তিনি কোটায় এমবিবিএস পড়াশোনা করে এসেছেন। তিনি এখন মেজর। ভবিষ্যতেও আরও উপরের পদে যাবেন। এটা দেখলে ভালো লাগে। সুতরাং কোটা যে নাই, তা নয়।

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাষাও আক্রমণের মুখে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে বসে ভাষার কথা বলব না, তা কি হয়? গ্লোবালাইজেশনের কারণে অনেক ভাষাই আক্রমণের মুখে।

এম এ মান্নান বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী কয়েকজন নারীকে পদক দিয়েছেন। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীরাও এগিয়ে আসবে, তাদেরও পুরস্কৃত করা হবে।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যারোমা দত্ত বলেন, আমরা অনেক এগিয়েছি, সংজ্ঞা না সংখ্যা সেটা আগে ঠিক করতে হবে। সংজ্ঞা তো আছে বহুকাল ধরেই, এখন সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রতিটা জোন ধরে আদিবাসীর শুমারি করতে হবে। পুরো জোন ধরে সমন্বয় করে আদিবাসী শুমারি করতে না পারলে কিছুই করা যাবে না। এটা আমাদের মানবাধিকার। টেকনিক্যালি কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক গোষ্ঠী থেকে ডাটাবেইজ করে সংখ্যা নিরূপণ করতে হবে। সমাজের এই বিভাজন দূর করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন অনেক অনুদান দিচ্ছেন। আদিবাসীদের জন্য কোটা অবশ্যই দরকার। সবাই মিলে কাজ করলে আদিবাসীদের সঠিক জনশুমারি নির্ধারণ করা যাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির প্রধান নির্বাহী ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের দেশে আদিবাসী শব্দ নিয়ে বেশ দ্বন্দ্ব রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে দেখা হয়, একটি নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট ভূমিতে বাস করে, যেখানে তাদের স্বকীয়তা হুমকির মুখে। সংখ্যা ও সংজ্ঞার কথা বলি, এটা আত্মপরিচয়ের সংকট। বাংলাদেশ ভাষাগত জাতীয়তাবাদের মধ্যে জন্ম হলেও এখানে অনেক ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষাভাষীদের অধিকারও দেইনি। সকল মানুষকে তার নীতিগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন,  তথাকথিত আদিবাসী সমস্যা নয়, এটা আত্মপরিচয়ের সংকট। এটাকে রাজনৈতিকভাবে নিরসন করতে হবে।

দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, পাকিস্তানের শোষণ-লাঞ্ছণা থেকেই মুক্তি পেতে আমরা এ দেশ স্বাধীন করি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আমরা সমাজে নানা ধরনের অস্থিরতা দেখি, বৈষম্য দেখি। সবকিছুর পরও আমরা দেখি সুন্দর একটি দেশ গড়ার। সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে নিয়েই এ দেশ এগিয়ে যাবে। এ দেশ সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষের। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই দেশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা শুমারি প্রয়োজন, এটা মূলত আজকের আলোচ্য বিষয়। কিন্তু আলোচনা চলে গেছে দাবিদাওয়া নিয়ে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ইত্যাদি। একটা জনগোষ্ঠীর স্বপরিচয়ে পরিচিত হতে পারছে না, এটা একটা সংকট। পরিচয়ের সংকটের এই বৈষম্য দূরীকরণ প্রয়োজন। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকল সম্প্রদায়কে স্বপরিচয়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এটা কোনো দাবি নয়, তাদের অধিকার।

হেক্স/কেপারের কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিক আসাদ বলেন, আত্মপরিচয় সংকটে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীরা। ২০২১ সালে যে জনশুমারি হবে, সেখানে সঠিক মানুষকে নিয়োগ দেওয়া দরকার। না হয় আমরা সঠিক পরিসংখ্যান পাব না। সঠিক পরিসংখ্যান না পেলে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে না, এই সুবিধা করুণা নয়, এটা তাদের অধিকার।

ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ বোরহান কবীর বলেন, উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী ছাড়া সবাই বৈষম্যের শিকার। একটি গোষ্ঠীর জন্য সরকার কাজ করছে। সাধারণ মানুষ বৈষম্যের শিকার। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও আমরা সেটা দেখেছি। একটি গোষ্ঠীর জন্য প্রণোদনা সহায়তা দিয়েছে সরকার। এই প্রণোদনা নিয়ে কে কোথায় টাকা পাচার করেছে, সেটা নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে ন্যায়বিচার করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে। এখানে দলিত কিংবা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না। সমতার বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।

মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রাইট বেইজড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের ম্যানেজার সাইবুন নেছা বলেন, সমাজের দলিত ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা কোনো শুমারি হয়নি। তাদের সংখ্যা নিশ্চিত করা না গেলে অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়। তাদের মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার থাকলেও এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যে দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা নিশ্চিত করতে হলে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর আলাদা আদম শুমারি প্রয়োজন।

কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি আজিজুল পারভেজের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, কাউন্টার পার্ট অব ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি চিফ অব পার্টি শহীদ হোসাইন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারা মারান্দি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পান্নালাল বাশফোর, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরামের মহাসচিব শিপন রবিদাস ও যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নরেণ চন্দ্র পাহান প্রমুখ।

বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email