কোথায় ছিলেন তিথি সরকার: পুলিশের দাবি অপহরণ নয়

প্রাপ্তি রহমান, বেনার নিউজ: ফেসবুকে ইসলামের মহানবী সম্পর্কে কটুক্তির অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ছাত্রী তিথি সরকার স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে থেকে কথিত অপহরণের ‘নাটক’ সাজিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

বৃহস্পতিবার ঢাকার সিআইডি সম্মেলন কক্ষে সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক জামিল আহমেদ বলেন, “তিথি সরকার আত্মগোপনে থেকে অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন। গত ১১ নভেম্বর বিকেল পৌনে চারটার দিকে নরসিংদীর মাধবদী থানার পাঁচদোনা এলাকা থেকে তিথিকে আটক করা হয়।”

“তিথি সরকার ফেসবুকে বিভিন্ন ধর্মীয় উস্কানিমূলক মন্তব্য ও তথ্য শেয়ার করতেন,” জানিয়ে জামিল আহমেদ বলেন, “তিথি ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে পারেন এই আশঙ্কা করছিলেন।”

সিআইডির দাবি, তিথি সরকার ও তাঁর সহযোগীরা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিলেন। গত ২ নভেম্বর একই অভিযোগে ঢাকায় গ্রেপ্তার নিরঞ্জন বড়ালের সঙ্গে তিথির যোগাযোগ ছিল।

তিথির বড় বোন স্মৃতি সরকার বেনারকে বলেন, নিখোঁজ হওয়ার ১৮ দিন পর তিথিকে পাওয়া যায়। তাঁরা বুঝতে পারছেন না তিথি কোথায় ছিলেন।

“তিথির সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ করে শুনলাম সিআইডি তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সে সম্পর্কেও আমরা জানি না,” বলেন স্মৃতি সরকার।

উল্লেখ্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিথি সরকার ফেসবুকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে পোস্ট দিয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে গত অক্টোবরে।

ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও তাঁর বিচার চেয়ে সভা–সমাবেশ করে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিথিকে গত ২৩ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক বহিষ্কার করে। কেন তাঁকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না, সে জন্য দশ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়।

এই ঘটনার একদিন পর তিথি তাঁর ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছে জানিয়ে পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন পল্লবী থানায় যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ হন তিথি।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত এর আগে বেনারকে বলেছিলেন, “এটা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের নতুন কৌশল। ২০১১ থেকে বারবার এমনটি আমরা দেখতে পাচ্ছি।”

যেভাবে উদ্ধার হলেন তিথি

গত ২৭ অক্টোবর তিথির বড়ো বোন স্মৃতি সরকার পল্লবী থানায় বোনের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়ে জিডি করেন। এতে তিনি বলেন, পল্লবী থানার দিকে যাওয়ার সময় তিনি নিখোঁজ হন।

তখন থেকেই সাইবার পুলিশ সেন্টার তাঁর খোঁজে নামে। এর মধ্যেই তারা জানতে পারে, তিথি আত্মগোপনে আছেন। তিনি গ্রেপ্তার বা অপহরণের নাটক সাজাচ্ছেন। এরপর নিখোঁজ হওয়ার ১৮ দিন পর বুধবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি জামিল আহমেদ জানান, তিথি গত ২৫ অক্টোবর মিরপুরের পল্লবীর বাসা থেকে তাঁর প্রেমিক শিপলু মল্লিকের বাগেরহাটের বাসায় যান। সেখানে শিপলুকে বিয়ে করার পর তিনি ঢাকায় আসেন ৯ নভেম্বর।

তাঁরা যখন নরসিংদীতে শিপলু মল্লিকের দূর সম্পর্কের চাচা দেবাশীষ রায়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন তখনই সিআইডি তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে।

পরে সেখান থেকে গত ১১ নভেম্বর বিকেলে তিথি সরকারকে ও রাতে পুরানো ঢাকার কাপ্তানবাজার থেকে তাঁর স্বামী শিপলু মল্লিককে আটক করা হয়।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার তিথি ও তাঁর স্বামীকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তিথিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। তবে তাঁর স্বামী শিপলু মল্লিকের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

জামিল আহমেদ বলেন, “সিআইডি জানতে পেরেছে নিরঞ্জন বড়াল তিথি সরকারকে দিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক পোস্ট দেওয়াচ্ছিলেন। গত ২ নভেম্বরের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে মামলা দায়ের হয়েছে, সেই মামলায় তিথি ও শিপলুকে আসামি করা হবে। আলাদাভাবেও মামলা করা হবে।”

নিরঞ্জন বড়াল গত ৩১ অক্টোবর ফেসবুকে পোস্ট দেন, সিআইডির ছাদে হাত–পা বাঁধা অবস্থায় তিথি সরকার উদ্ধার। গত ২ নভেম্বর গুজব ছড়ানোর দায়ে তাঁকে রাজধানীর রামপুরা বনশ্রী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি জানায়, নিরঞ্জনের সঙ্গে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার সপ্তাহ দুয়েক আগেও তিথি সরকারের যোগাযোগ হয়েছিল।

সার্বক্ষণিক নজরদারি

সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক কামরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, অস্থিতিশীলতা এড়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর তাঁদের সার্বক্ষণিক নজরদারি আছে।

“ধর্ম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটছে কি না তা সব সময় নজরদারি করছে সাইবার পুলিশ সেন্টার,” জানান কামরুল ইসলাম।

সম্প্রতি ফ্রান্সে ইসলামের মহানবীর কার্টুন প্রকাশকে সমর্থন করে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বক্তব্যের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানির বেশ কিছু ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে কুমিল্লার মুরাদনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনাও ঘটে।

গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় দিনাজপুরের দলিত সম্প্রদায়ের একজন কলেজ ছাত্রী, ঢাকায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীও রয়েছেন।

গত ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলন করে। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, “ধর্ম অবমাননার জিগির তুলে দিনাজপুর-কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন-হত্যার ঘটনা ঘটছে।”

এই প্রেক্ষাপটে তাঁরা গত ৭ নভেম্বর সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওবপর হামলায় ৫৬ জন আহত হন। একই সময়ে ৫৬টি উপাসনালয় ও মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন নন, কোরান অবমাননার কথিত অভিযোগে লালমনিরহাটের একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমকেও পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

হিউম্যান রাইটস ফোরাম বৃহস্পতিবার জুমে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে, যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন–নিপীড়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

ওই সভায় উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, “আগামী বছর স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই স্বাধীনতার মূল স্পৃহা ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা। কিন্তু আজও শুনতে হচ্ছে সবাই সমানাধিকার ভোগ করছেন না।”

সম্প্রতি কুমিল্লায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কেন কমছে, কেন এমন অনিশ্চয়তা, কেন সবাই সমানাধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবে না—এসবের অনুসন্ধান এবং প্রতিকার জরুরি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।