করোনায় বিধ্বস্ত বিএনপি

nagad

বিশ্বব্যাপী মহামহারী করোনা ভাইরাসে গত এক বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি বেশি আক্রান্ত হয়েছে। দলটির সিনিয়র নেতা থেকে শুর’ করে কর্মী-সমর্থকসহ দেশব্যাপী প্রায় ৪ শতাধিকের বেশি করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

আর আক্রান্ত হয়েছে দলটির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতা থেকে শুর’ করে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্যসহ প্রায় হাজারের কাছাকাছি। এমত অবস্থায় আবারো গঠিত দলীয় করোনা পর্যবক্ষেন সেল কার্যক্রম শুর’র উদ্যোগ নিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়র’ল কবির খান।

এদিকে দলটির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হওয়া বেশ কয়েকজন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক বছরে দলটির ৪৪০ জন নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। অনেকে সপরিবারে আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ৩ এপ্রিল সব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে দলটি। চলতি বছরেই ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। মাঠেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল সিরিজ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি এই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপরদিকে করোনার কারণে গত বছর টানা ছয় মাসের মতো বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল। এরপর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু হলেও করোনার কারণে খুব বেশি সুবিধা করা যায়নি। আবার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত বুধবার দলের সব সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। গত মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচি স্থগিত করে দলটি। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি গঠিত ‘জাতীয় করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সেল’ ফের তাদের কাজ শুরু করেছে।

এই সেল চিকিৎসা, টিকার কার্যক্রমসহ দলের ত্রাণ তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি সরকারের কোনো তথ্যের গরমিল থাকলে তা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরবে। গত বছর এপ্রিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে উপদেষ্টা ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যের পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা হয়।

সেলের আহ্বায়ক ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ সেলের কাজও আবার শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সাংগঠনিক সম্পাদকদের বলা হয়েছে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য। দলের সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাস্থবিধি মেনে দলের নেতাকর্মীরা এবারও মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

অন্যদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দলটির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন- স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. একেএম আজিজুল হক, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম, সাবেক ছাত্রনেতা রকিবুল ইসলাম বকুল, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন মিডিয়া কমিটির সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল প্রমুখ। এর মধ্যে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুহুল কবির রিজভীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এদিকে সিনিয়র নেতাদের অনেকে সপরিবারে আক্রান্ত হয়েছেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তার স্ত্রী বিলকিস আক্তার হোসেন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও স্ত্রী রিফাত হোসেন এবং হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও স্ত্রী কামরুন নাহার সৃষ্টি, দুই মেয়ে জান্নাতুন ইসি সূচনা ও অপরাজিতা খানও আক্রান্ত। সেলিমুজ্জামান সেলিম ও তার স্ত্রী সাবরিনা শুভ্রা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর শারীরিক অবস্থা ‘অপরিবর্তিত’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘রুহুল কবির রিজভীর অক্সিজেন লেবেল কিছুটা আপ-ডাউন করলেও সার্বিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছেন। আর সপরিবারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল। গত শুক্রবার হাবিব-উন নবী খান সোহেলের মেয়ে জান্নাতুল ইলমি সূচনা ফেসবুকে লিখেছেন, হাসপাতাল থেকে যেদিন বাসায় আসে, সেদিনই মায়ের গলা ব্যথা-ঠাণ্ডা-জ্বর। পরদিন দেখি কোনো ঘ্রাণও পাচ্ছে না। করোনা টেস্ট করে রিপোর্ট আসলো পজিটিভ। পরদিন বাসার সবাই টেস্ট করাই। গত সন্ধ্যায় রিপোর্ট পেলাম। আমাদের পরিবারের চারজনেরই করোনা পজিটিভ এসেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে আহত হন হাবিব-উন নবী খান সোহেল। এরপর থেকে তিনি রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

আর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি জানিয়েছে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সিলেট সাবেক মহানগর বিএনপি সভাপতি এম এ হক, ঢাকা উত্তর মহানগর বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসন, কুমিল্লা বিভাগ সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) রুহুল আলম চৌধুরী, ওলামা দলের কেন্দ্রীয় আহবায়ক কমিটি সদস্য মওলানা কাসেমী, গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার আহাদ আহমেদ, ঢাকা পল্লবী থানা বিএনপির সহসভাপতি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী টি এম গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি লায়ন মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি সভাপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য অ্যাডভোকেট কবির চৌধুরী, জাতীয় ট্যাক্সসেস বার সভাপতি অ্যাডভোকেট গফুর মজুমদার, শ্রমিক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক মোল্লা, গাজীপুর শ্রীপুর পৌরসভা বিএনপি মেয়র প্রার্থী শহিদুল্লাহ শহীদ আমেরিকার বোস্টন বিএনপি ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মিতোষ বড়ুয়া, বিএনপি সহ-স্থানীয় সরকার সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন সরকার ভজে ও সাবেক এমপি এ টি এম আলমগীর প্রমুখ।

দলের কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, করোনাকালে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় গত বছর মার্চে করোনা শুরুর পর থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতৃবৃন্দ ৫৪ লাখ ১২ হাজার ৪১৬টি পরিবারকে সহযোগিতা করেছেন। এই সহযোগিতার আওতায় মোট ২ কোটি ১৬ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬৪ জন মানুষ উপকৃত হয়েছে।

এছাড়া ড্যাব, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন ও দলের নেতৃবৃন্দ কয়েক লাখ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও পিপি বিতরণ করেছে। করোনা এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। যে কারণে আবারও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

 



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email