ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ‘হ্যাম-বেথ’

ঐতিহাসিক বাস্তবতায় 'হ্যাম-বেথ'

উইলিয়াম শেকসপিয়ারকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও নাট্যকার হিসেবে মান্য করা হয়। ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল জন্ম নেওয়া এ অসাধারণ সাহিত্যিক মৃত্যুবরণ করেন ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল। তিনি শব্দবিন্যাসের স্বকীয়তায় সাহিত্যাঙ্গনে সৃষ্টি করেছিলেন নতুন ধারার সূচনা। সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন নাটক। যা মঞ্চে গতিমান মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি দর্শকের সম্মুখে মূর্ত করে তোলে। এটি মানুষকে সমাজের গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখে এসেছে। প্রাচীন যুগের সাহিত্যে বিয়োগান্ত প্রেমের উপাখ্যানের একটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। সে বিষয়গুলো একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যখন আলোচনা-পর্যালোচনা হয়, তখন বুঝতে হবে এর মর্মার্থ অনেক গভীরে নিহিত রয়েছে। শেকসপিয়ারের নাটকে এ ধারাটিই প্রাধান্য পেয়েছে।

৪৫৭ বছর পরেও একজন মানুষ তাঁর কর্মের কারণেই জীবিত থাকতে পারেন, এটির উদাহরণ শেকসপিয়ার। তাঁর অন্যতম আলোচিত ও পাঠকপ্রিয় দুটি নাটক ‘হ্যামলেট’ এবং ‘ম্যাকবেথ’। তাঁর রচিত এই ঐতিহাসিক চিত্রনাট্য আজও জীবন্ত। এ দুটি নাটক অবলম্বনে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে সাজানো নাটক ‘হ্যাম-বেথ’। এই ভিন্নতা তৈরি করেছেন, হাসনাত আবদুল হাই। বইটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী।

শেকসপিয়ারের হ্যামলেটের মূল গল্পটি ‘এমলেথ’ নামক একটি উপকথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা বলেই ধারণা করা যায়। যা ১৩ শতকের কাহিনিকার স্যাক্সো গ্রামাটকাসের রচিত গেস্টা ডেনোরামে সংকলিত রয়েছে। পরবর্তী সময়কালে ১৬ শতকের পণ্ডিত ফ্রাঙ্কোয়েস ডি বেলফরেস্টও গল্পটি পুনরায় বলেছেন। তৎকালীন কিংবদন্তি অভিনেতা রিচার্ড বার্বেজকে মূল চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে তিনি বিয়োগান্ত নাটকটি সাজিয়েছিলেন। আর রচিত হওয়ার পর গত সাড়ে চারশ বছর ধরে হ্যামলেট চরিত্রটি অগণিত কিংবদন্তি অভিনেতাস্বরূপ দিয়ে আসছেন।

‘ম্যাকবেথ’ শেকসপিয়ারের সবচেয়ে ছোট ট্র্যাজেডি নাটক। যার মূল উপজীব্য একটি রাজহত্যা ও তার ফলে সংঘটিত ঘটনাবলি। স্কটিশ সেনাপতি ম্যাকবেথ যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসার পথে একদল রহস্যময় শক্তি তাদের পথরোধ করে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করে বলেছিল, ম্যাকবেথ হবে কডোর প্রধান ও পরে রাজা এবং ব্যাংকো হবে রাজার আদি পিতা। ম্যাকবেথের চিঠি পেয়ে লেডি ম্যাকবেথ জানতে পারে বিস্তারিত, উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ম্যাকবেথকে প্ররোচিত করে রাজা ডানকানকে হত্যায়। নিজ বাড়িতে রাজাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন ম্যাকবেথ। দোষ চাপানো হয় পরিচারকদের উপর। তবে এরপর শত্রুতা ও সন্দেহের কারণে একের পর এক খুন করেন তিনি। ম্যাকবেথ হয়ে ওঠেন এক স্বৈরাচারী শাসক। একের পর এক ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং তার অনুবর্তী গৃহযুদ্ধের ফলে ম্যাকবেথ ও তার স্ত্রী দুজনই উন্মাদ হয়ে যান। লেডি ম্যাকবেথ আত্মহত্যা করেন এবং ম্যাকবেথ ম্যাকডাফের হাতে পরাজিত ও নিহত হন।

এ দুটি নাটক অবলম্বনেই রচিত হয়েছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘হ্যাম-বেথ’। যেখানে রয়েছে লেখকের নিজস্ব চিন্তার রূপান্তর। তথাকথিত চিন্তার বাইরে গিয়ে দাঁড় করিয়েছেন নতুন আঙ্গিক। যে কারণে বইটি হুবহু নাটকের অনুবাদ কিংবা ভাবানুবাদ নয়। শেকসপিয়ারের দুটি নাটক অবলম্বনে লিখলেও এখানে পার্থক্যও রয়েছে বেশ। যেখানে বাস্তবতাই উঠে এসেছে। তিনি দুটি নাটকের প্রধান চরিত্রগুলোকে গ্রহণ করে তাদের বিন্যস্ত করেছেন একটি কাঠামোতে। নাটক দুটির অনুকরণ নয়, ‘হ্যাম-বেথ’-এ হাসনাত আবদুল হাই অধিকাংশ ঘটনাই নতুন করে নির্মাণ করেছেন। এখানেই লেখকের সৃষ্টির সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। বইটি পড়তে গিয়ে বারবার পাঠকের চিন্তা ধাক্কা খাবে। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কত সহজে আরেকজন সৃষ্টিশীল মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে- তার নিদর্শন এই বইয়ে পাওয়া যাবে। এখানে হ্যামলেটের পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার যে সংকল্প, সেটি চমৎকারভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে মূল নাটকে যেভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে, এখানে সেটি নেই। যা পাঠককে নতুন চমক দেবে।

‘ম্যাকবেথ’ নাটকে ক্ষমতার জন্য হত্যা ও পরিণতিতে মৃত্যু প্রধান বিষয়। ‘হ্যাম বেথ’ নাটকও সেই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা। ক্ষমতা অধিকারের জন্য রাজা ডানকানের হত্যাকাণ্ডও দেখিয়েছেন। পার্থক্য হলো- ‘হ্যাম-বেথ’ এ লেখক দুটি বিষয়কে অনেক সাবলীলভাবে একই কাহিনির কাঠামোয় নিয়ে এসেছেন। যাতে পাঠক নতুনত্ব পাবে।

হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ নাটকের যে মূল বিষয় হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল, হত্যার প্রতিশোধ- এসব ট্র্যাজেডি নতুন আঙ্গিকে সাজানোর যে বিষয়টি তা পাঠককে সহজেই টেনে নিয়ে যাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মূল কাহিনির সাদৃশ্য ছাড়া প্রায় সব ঘটনাই নতুনভাবে নির্মিত। যা সত্যিই অবাক করার মতো। নাট্যজগতে যারা রয়েছেন, তাদের মাঝে পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি তরুণ শিল্পপ্রেমীদের মনেও দাগ ফেলতে পারে বইটি।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ