Skip to content

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো জায়গাও কমে আসছে

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো জায়গাও কমে আসছে

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, চ্যাটজিপিটি, মঙ্গলগ্রহ, হিমালয়, চাঁদ সব জয় করে এসে বাংলাদেশে আমরা মানুষ হত্যা করছি, শুধু তাদের পরিচয় আহমদিয়া বলে।

বকশিবাজারের বদরুন্নেছা কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, কলেজটির দেয়াল ঘেঁষে একটি মসজিদ আছে। অন্য কলেজ থেকে আসা একটি মেয়ে বলেছিল, জানো, এটা না কাদিয়ানীদের মসজিদ। এ কথা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম, কারণ তখনো আমি কাদিয়ানী শব্দটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না।

এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মসজিদ তো সব একই। তাহলে এই মসজিদকে আলাদা করে চেনাচ্ছো কেন? ও বলেছিল, আমিও ঠিক জানি না। তবে এটা জানি, এটা কাদিয়ানী বা আহমদিয়াদের মসজিদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক জুটিকে দেখেছি বিয়ে নিয়ে সমস্যায় পড়তে। কারণ ছেলেটির পরিবার আহমদিয়া। তাদের বিয়েটা এই কারণেই হলো না দেখে জানার চেষ্টা করেছিলাম, আহমদিয়া ইস্যুটি নিয়ে এই আলোচনা কেন। ব্যস, ওই পর্যন্তই। পরে আর কখনো এ নিয়ে কথা হয়নি। একটি আহমদিয়া পরিবারকে চিনলেও এই প্রসঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলাটা অভব্যতা বলেই জেনেছি।

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, চ্যাটজিপিটি, মঙ্গলগ্রহ, হিমালয়, চাঁদ সব জয় করে এসে বাংলাদেশে আমরা মানুষ হত্যা করছি, শুধু তাদের পরিচয় আহমদিয়া বলে। পঞ্চগড়ে জাহিদ নামের ছেলেটিকে আহমদিয়া জামাতের সালানা জলসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে ‘তৌহীদি জনতা’। তার অপরাধ, তিনি আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত, যাদের ‘কাদিয়ানী’ বলা হয়। যারা নিজেদের মুসলমান বলে মনে করেন, কিন্তু সুন্নি মুসলমানদের একটা অংশ তাদের মুসলিম বলে মনে করেন না।

এখানে প্রশ্নটা যুক্তির, প্রশ্নটা বিচারের। কে আমাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে যে, কে মুসলমান, কে মুসলমান নয়, তা বিচার করার? কারা ধর্ম পালন করছে, কারা করছে না, তা দেখার? এর চাইতেও বড় কথা, কেউ যদি মুসলমান নাও হয়, তাকে কি হত্যা করা যায়? তাদের ধর্মীয় আলোচনায় হামলা চালানো যায়? নাকি তাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া যায়? এর কোনোটাই করা যায় না।

কিন্তু এরপরেও এক শ্রেণীর অতি আগ্রহী মানুষ এই হীন কাজ করেছে। পঞ্চগড় শহরের উপকণ্ঠে আহম্মদনগর এলাকায় আহমদিয়া জামাতের জলসা বন্ধের দাবিতে জুম্মার নামাজের পর পঞ্চগড় শহরের বিভিন্ন মসজিদ থেকে মিছিল বের করেছিল। শুক্রবারের মতো পবিত্র একটি দিনে যারা মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা কীভাবে নিজেদেরকে সহি মুসলিম বলে দাবি করেন?

পূজামণ্ডপে যারা হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাঙচুর করেন, যারা লালন ভক্তদের ধরে চুল কেটে দেন, যারা ব্লগারদের হত্যা করেন, যারা হুমায়ুন আজাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে কোপান, যারা নারীদের অসম্মান করেন, যারা অভিজিৎ-দীপনকে হত্যা করেন, তারাই আহমদিয়াদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছেন। তারা কোনো ভিন্ন মত ও পথকে সহ্য করতে পারেন না, পিটিয়ে মুখ বন্ধ করতে চান। তাদের বিরুদ্ধে আজকে যদি সরকার ব্যবস্থা না নেয়, আমরা যদি কথা না বলি, তাহলে তারাই একদিন তাদের মতের সঙ্গে মিলবে না বলে আপনার, আমার ঘরে ঢুকে আমাদেরও হত্যা করতে পারে।

আহমদিয়া মুসলিম জামাতের উদ্ভব হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, পাঞ্জাবে, মির্যা গোলাম আহমদের জীবন ও শিক্ষার ভিত্তিতে।

পাকিস্তান সরকার ১৯৭৪ সালে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে। এমনকি পাকিস্তানের নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আব্দুস সালাম আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ছিলেন বলে সেখানে তাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সৌদি আরবে আহমদিয়াদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি তাদের কেউ সেখানে গোপনে হজ করতে গেলেও আটক করা হয়।

আহমদিয়ারা মনে করেন, তাদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করার অধিকার কারো নেই।

মুসলমানদের প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে আহমদিয়াদের মতবাদের ভিন্নতা থাকায় বিভিন্ন দেশে সুন্নি মুসলমানদের একটা অংশ প্রথম থেকেই আহমদিয়াদের বিরোধিতা করে আসছেন। বাংলাদেশেও হেফাজতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী বেশ কিছু সংগঠন দাবি জানিয়ে আসছে, পাকিস্তান যেভাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশেও যেন সেটা করা হয়।

বাংলাদেশে যে যার মতো করে ধর্মপালন করতে পারবেন, এমন অধিকার একজন নাগরিককে দিয়েছে সংবিধান। বাংলাদেশের পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, কুমিল্লা, জামালপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে আহমদিয়ারা থাকেন। এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো পঞ্চগড়ে নিজেদের মতো করে ‘সালানা জলসা’র যে আয়োজন করেছিলেন, হামলা চালিয়ে সেটা বন্ধ করতে হবে কেন?

এই হামলা চালানোর মাধ্যমে কি ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে? ইসলাম কি মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করার কথা বলে? আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে বাধা দেয়ার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০১৯ সালেও পঞ্চগড়ে বার্ষিক জলসা আয়োজনের সময় তাদের ওপর হামলা চালানো,তাদের বাড়ি ঘরে ভাঙচুর এবং অগ্নি সংযোগের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিল।

বহু বছর ধরে এই আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সম্প্রীতির সঙ্গেই বসবাস করে আসছেন। তারাও এই দেশেই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছেন, খেলাধুলা করেছেন, অনুষ্ঠান করেছেন, ঈদ উদযাপন করেছেন, কিন্তু কখনো কোনো বিরোধ হয়নি।এখন কারা এই ধরণের একটি সাম্প্রদায়িক ধারণাকে উস্কে দিচ্ছে যে, কাদিয়ানীদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে এবং এই ইস্যুটিকে নিয়ে আমাদের শঙ্কায় পড়তে হচ্ছে?

বিবিসি জানিয়েছে, কয়েকদিন আগে থেকেই কয়েকটি সুন্নি সংগঠন দাবি করে আসছিল, যেন আহমদিয়াদের জলসা করতে দেওয়া না হয়। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পঞ্চগড় শাখা, সম্মিলিত খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ইত্যাদি। তারা এই দাবিতে পঞ্চগড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধও করেছিল।

একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান বন্ধের এমন  দাবি কেউ কি করতে পারেন? শত শত মানুষ যখন মহাসড়ক অবরোধ করে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়েছে, তখন সেটা ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা জায়েজ?

আহমদিয়া সম্প্রদায় নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে একসময় ভারত থেকে পাকিস্তানে এসেছিলেন। ভেবেছিলেন, নিজেদের জন্য একটি আলাদা দেশ পেতে যাচ্ছেন, যেখানে তারা ধর্মের চর্চা করতে পারবেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালে লাহোরে দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর তারা অনুভব করলেন, ভুল হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান তাদের অমুসলিম বলে আইনত ঘোষণা দেওয়ার পর এখন তারা প্রকাশ্যে কিছুই করতে পারেন না।

এর মধ্যে থেকে যারা বাংলাদেশে বসতি গড়েছেন, তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হলেও নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো একটা জায়গা অন্তত ছিল। ক্রমশ তাও কমে আসছে। এই ধরণের অবিচারের বিরুদ্ধে সরকারের উচিৎ নীরবতা ভাঙা ও দোষীদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা। আর আমরা যারা মূলধারার প্রগতিশীল মানুষ বলে নিজেদের মনে করছি, তাদের উচিৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা। নয়তো একদিন এই মূলধারার মানুষদেরও নিঃশ্বাস নেওয়ার আর উপায় থাকবে না।

শাহানা হুদা রঞ্জনা, যোগাযোগকর্মী

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

বার্তা সূত্র