আল্লামা শফীকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে হেফাজতের বক্তব্য

আল্লামা শফীকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে হেফাজতের বক্তব্য
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীকে হত্যার অভিযোগ এবং এ সংক্রান্ত মামলার পেছনে ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ আছে বলে মনে করেন দলটির বর্তমান নেতারা। দেশকে অস্থিতিশীল করতে এ চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ তাদের।

বুধবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের নেতারা এসব কথা বলেন।

হেফাজতে ইসলাম নতুন কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আফছার আজাহারী লিখিত বক্তব্য সাংবাদিকদের পড়ে শোনান।

লিখিত বক্তব্য পুরোপুরি তুলে ধরা হলো:

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধান শাহ আহমদ শফী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বড় মাদ্রাসা হিসেবে হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক ছিলেন তিনি। মারা যাওয়ার আগে তিন দিন ধরে ওই মাদ্রাসায় আহমদ শফীকে অবরুদ্ধ করে ছাত্র বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ শফীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হেলিকপ্টারে ঢাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর থেকে শফীর অনুসারীরা তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছিলেন। শফীর মৃত্যুর পর গত ১৫ নভেম্বর প্রতিনিধি সম্মেলন করে হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আমির নির্বাচিত হন আগের কমিটির মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী। মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন নুর হোসাইন কাসেমী, যিনি কয়েক দিন আগে মারা যান। নতুন কমিটিতে শফীপন্থিদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর গত ১৭ ডিসেম্বর আহমদ শফীকে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এনে তার শ্যালক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন বাদী হয়ে হেফাজতের ৩৬ নেতার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলা তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়, আহমদ শফীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগে মামলা একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত। মাদ্রাসার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাদের হয়রানি করার হীন ষড়যন্ত্র থেকে মামলা করা হয়েছে। ইসলামের নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত একটি কুচক্রীমহলের পায়ের তলায় মাটি না থাকায় তারা আহমদ শফীর মৃত্যু নিয়ে চক্রান্তে মেতেছে।

শফীপন্থিদের প্রতি ইঙ্গিত করে হেফাজতের বর্তমান নেতাদের দাবি, একটি চিহ্নিত দালালগোষ্ঠী শাহ আহমদ শফীকে জিম্মি করে হাটহাজারী মাদ্রাসায় ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। সেখানে নানা অনিয়মের পাশাপাশি ছাত্রদের ওপর হয়রানি-নির্যাতন চালানো হতো। কয়েকজন শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। মহলটির স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অনাচারের কারণে মৃত্যুর আগে আহমদ শফীর জনপ্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল এবং তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

আহমদ শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অনেক আগে থেকেই আহমদ শফীর শারীরিক অবস্থা নাজুক ছিল। বেশ কয়েকবারই তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। মামলায় তথাকথিত হত্যার যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো অতিরঞ্জন ও মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন হেফাজত নেতারা। আমরা মনে করি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছায় উনার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। তাকে হত্যা করা হয়েছিল এমন কোনো মেডিকেল রিপোর্টও নেই। এরপরও মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে এবং বিবরণে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা কেউই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ষড়যন্ত্র ও উদ্দেশ্যমূলক।

হেফাজতের নেতারা দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে বলেন, মাদ্রাসায় ছাত্র বিক্ষোভের নেপথ্যে শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানির স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে ধরেন হেফাজত নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাদ্রাসার তৎকালীন শিক্ষা পরিচালক নূর আহমদকে পাশ কাটিয়ে সহকারী শিক্ষা পরিচালক আনাস মাদানি দীর্ঘদিন থেকে ছাত্রদের নানাভাবে হয়রানি করে আসছিলেন। একক সিদ্ধান্তে ছাত্রদের ভর্তি ফরম এবং দাওরায়ে হাদিস ছাত্রদের বোর্ড পরীক্ষার প্রবেশপত্র আটকে রাখেন মাদানি। অনেক ছাত্রদের বোর্ডিংয়ের খাবার এবং আবাসিক সিট অন্যায়ভাবে বাতিল করেছেন। তার অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারি কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে শফীর মৃত্যুর দুই দিন আগে সর্বস্তরের ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে আহমদ শফী তার ছেলেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারও করেন।

হেফাজত ইসলামের নেতারা আরও দাবি করেন, শফীর ছেলে আনাস মাদানির দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছচারিতা, অনিয়ম, ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর জুলুম-নির্যাতনসহ নানা দুর্নীতি স্পষ্ট হলে আল্লামা শফী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি আনাস মাদানির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করে শুরার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। শুরার সদস্যরা সেটা গ্রহণ করতে রাজি হননি। কিন্তু তার দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে শুরা সদস্যরা তাকে প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে হেফাজত নেতাদের মধ্যে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, জুনায়েদ বাবুনগরী, মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, নোমান ফয়জী, তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ শোয়াইব, কেফায়েতুল্লাহ, জসিম উদ্দীন, লোকমান হাকিম, কবির আহমদ, হাবিবুল্লাহ আজাদি, আজিজুল হক ইসলামাবাদি, দিদার কাসেমী, নাছির উদ্দীন মুনীর, আশরাফ আলী নেজামপুরী, ফোরকান আহমদ, ওমর কাসেমী, মাহমুদুল হাসান ফতেপুরি, আতাউল্লাহ কৈয়গ্রাম. মীর ইদরিস নদভী, জাকারিয়া নোমান ফয়জী, মোহাম্মদ আহসানুল্লাহ, শফিউল আলম, নুরুল আবসার আজহারী, আনোয়ার শাহ আজহারী, হারুন আজিজ নদভী, মুফতী আবু সাইদ, মুফতী রাশেদ, আব্দুল্লাহ নাজিব, মোহাম্মদ বাবুনগরী, আব্দুস সবুর, মো. রফিক, নূর মুহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র: সময় টিভি


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।