‘আম্ফান’র চেয়েও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘যশ’ প্রবলবেগে আঘাত হানতে পারে

গেল বছর যে সময়ে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’সৃষ্টি হয়েছিল এক বছর পরে এসে ঠিক এই সময়েই বঙ্গোপসাগরে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে। ওমানের দেওয়া নামে নতুন জন্ম নেয়া ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ হয়েছে ‘যশ’।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগামী বুধবার নাগাদ ঘূর্ণিঝড় ‘যশ’ ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গের দিঘা হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে খুলনা উপকূল পর্যন্ত প্রবলবেগে আঘাত হানতে পারে।

এবারও করোনা ভাইরাস মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। সংক্রমণ সামাল দিতে চলছে লকডাউন ওরফে বিধিনিষেধ। তারমধ্যেই ‘যশের’পূর্বাভাস চিন্তা আরও বাড়িয়েছে। আম্ফানে তছনছ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ উপকূলের বিভিন্ন জেলা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গ্রামবাংলার কাচা বাড়ি, দোকানপাট। রাস্তায় রাস্তায় উপড়ে পড়েছিল বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ। প্রাণহানিও হয়েছিল বহু মানুষের। তার এক বছরের মাথায় আবারও ঘূর্ণিঝড়। সবমিলিয়ে ‘আম্ফানের’চেয়ে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ‘যশ’। ফলে যশেই আম্ফানের ভয় পাওয়া শুরু হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ঠিক কতটা হতে পারে এবং প্রথম কোথায় আছড়ে পড়বে, সে ব্যাপারে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তারা ঝড়টির গতিপ্রকৃতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে।

কলকাতা আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, দু’একদিনের মধ্যে যশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে, উত্তর আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটি পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। পরে উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আগামী বুধবার ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের খুলনা উপকূলে পৌঁছাতে পারে। আরও দু’একদিন পরে ঘূর্ণিঝড়ের আদ্যপান্ত বলা যাবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিস।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে গত বছরের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রশাসন নবান্নের শীর্ষ কর্তাদেরকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরইমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা প্রশাসনকে যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপকূলবর্তী সাইক্লোন সেন্টারগুলিকে আগাম প্রস্তুতি রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে কাজ শুরু করেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম-সচিব বলেছেন, আমরা আবহাওয়া অফিসের বার্তার ওপর নজর রাখছি।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চলতি মাসের দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়ে এবার বিপর্যস্ত হতে পারে ভারতের পূর্ব উপকূল। ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় ‘তাওকতের’শক্তিতে ধরাশায়ী মহারাষ্ট্র, গুজরাত, কেরল, কর্ণাটক, গোয়ার মতো রাজ্যগুলো। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘যশ’। মধ্য-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া অতি গভীর নিম্নচাপ হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রুপান্তরিত হচ্ছে। আগামীকালের মধ্যে সেই ঘূর্ণিঝড় আরও শক্তি বাড়িয়ে উত্তর আন্দামান সাগরে পৌঁছে যাবে। ধীরে ধীরে ২৪-২৬ মে’র মধ্যে উড়িষ্যা উপকূলসহ দীঘা ও খুলনা উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে সেই ঝড়। এর জেরে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মৎস্যজীবীদের রবিবার সন্ধ্যার মধ্যেই উপকূলে ফিরে আসতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আবহাওয়া অফিস বলছে, প্রথমে উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অভিমুখ থাকলেও পরে অভিমুখ পরিবর্তন হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের অনুমান, বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ-উড়িষ্যা উপকূল এলাকাতেই আছড়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা ঘূর্ণিঝড়ের। সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের দিঘা-শঙ্করপুর উপকূল থেকে উড়িষ্যার বালাসোর উপকূলের মাঝে এটি স্থলভাগের প্রবেশ করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সুন্দরবনের বাংলাদেশ উপকূল থেকে ওড়িশা উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। ঘূর্ণিঝড় যশের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল হবে।

শুক্রবার (২১ মে) থেকেই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ, বাংলা-ওড়িশা উপকূলে মৎস্যজীবীদের রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে উপকূলে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৪ মে সোমবার থেকে সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে মৎস্যজীবীদের।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের জেলাগুলোতে বৃষ্টি শুরু হবে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে উপকূলের জেলা ছাড়াও অন্যান্য এলাকায়। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা ঝোড়ো হাওয়া বইবে প্রায় সব জেলাতেই। উপকূল নিকটবর্তী জেলায় সবথেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এই ঘূর্ণিঝড় কতটা তাণ্ডবলীলা চালাবে তা রবিবার নিম্নচাপ তৈরির পরেই বিস্তারিত জানা যাবে। তবে এই সিস্টেমের প্রভাবে দেশে বর্ষা যথাসময়ে চলে আসবে। প্রথমে আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড় টাউটে ও পরে বঙ্গোপসাগরে আরও একটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ায় আবহাওয়াবিদদের অনুমান, এবার দু-এক দিন আগেই বর্ষা ঢুকে যেতে পারে। সাধারণত ১ জুন বর্ষা প্রবেশ করে।

গত কয়েকদিন ধরেই প্রচণ্ড গরমে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ায় ভ্যাপসা গরম পোয়াতে হচ্ছে সবাইকে। এই আবহেই আগামী সপ্তাহে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, সাগরে অনুকূল পরিবেশ থাকায় ঘূর্ণাবর্তটি ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে সেটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হচ্ছে। তবে অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই ঘূর্ণিঝড়টি সুপারসাইক্লোনে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email