আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন মোশতাক

* কানাই চক্রবর্ত্তী * খন্দকার মোশতাক আহমেদ নভেম্বরের টালমাটাল পরিস্থিতির সময় বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং তার নিজের জন্য আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। এছাড়াও, প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় খালেদ মোশারফের বিরুদ্ধে আমেরিকার সাহায্যও কামনা করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরনো সর্ম্পকের দাবি নিয়ে তিনি আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রস্তাব দেন।
প্রস্তাব পাওয়ার পর আমেরিকার পক্ষ থেকে মোশতাক আসতে চাইলে তাকে স্বাগত জানানো হবে বলে জানানো হয়। বলা হয়, তার জীবনের যদি আশু বিপদ থাকে তাহলে তাকে তাদের দূতাবাসেও সাময়িক আশ্রয় দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হবে। মোস্তাকের মূখ্যসচিব মাহবুবুল আলম চাষী রাষ্ট্রদূত রোস্টারের কাছে টেলিফোনে এই প্রস্তাব রাখেন। খুনি ফারুক ও রশিদের জন্যও এমন আশ্রয় খুঁজছিলেন তিনি।

আমেরিকান সাংবাদিক লেখক বি জেড খসরু‘র ইংরেজিতে লেখা ‘বাংলাদেশ মিলিটারি ক্যু সিআইএ লিঙ্ক’ গ্রন্থে এ সর্ম্পকে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সিরাজ উদ্দিন সাথী। বাংলাদেশে‘ দি ইউনিভার্সেল একাডেমি গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে।
পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধুর খুনিরা বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের বিশেষ বিমানে উড়ে ব্যাঙ্কক চলে যায়। তাদের এই চলে যাওয়ার সবধরনের ব্যবস্থা করে দেয় প্রেসিডেন্টের সচিবালয়। এর আগে খালেদ মোশারফ, শাফায়েত জামিল, হাফিজ ইকবাল, স্কোয়ার্ডন লিডার লিয়াকত গোপন বৈঠক করেন। বৈঠক থেকে বের হয়ে এসে খালেদ মোশারফ ডালিমকে পরিস্কার জানিয়ে দেন মোশতাকের স্থলে প্রধান বিচারপতি নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে, ১৫ আগস্টের সেনা নেতৃত্বকেও সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু, মোশতাক তাদের বিদেশ পাঠানোর জন্য খালেদ মোশারফের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেষ্টা চালিয়ে যান। বলা যেতে পারে, মোশতাকের ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ তখন থেকেই সুতার উপর ঝুলতে থাকে। ঠিক তখন তার মূখ্য সচিব মাহবুবুল আলম চাষী কথা বলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গে।

বি জেড খসরু এ নিয়ে লিখেন, ‘৩ নভেম্বর ২টা ২০ মিনিটে মাহবুবুল আলম চাষী বোস্টারকে টেলিফোনে বলেন, প্রেসিডেন্ট (মোশতাক) তাকে জানাতে বলেছেন, যদি অবস্থা এমন হয় যে কারো রাজনৈতিক আশ্রয়ের দরকার তাহলে তার ব্যবন্থা করা যাবে কিনা। বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক এবং রশিদের জন্য এমন আশ্রয় খুঁজছিলেন তিনি। তবে, এক পর্যায়ে তিনি একথাও জানাতে চান যে, ঐ দু’জন ছাড়াও প্রেসিডেন্টের জন্যও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রয়োজন হতে পারে। বোস্টার বিশ্বাস করে উঠতে পারেন নি, তাই আবার বলেন, আবার বলবেন কি? চাষী আবার বলেন, প্রেসিডেন্ট  নিজেও  রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইচ্ছা ব্যক্ত করতে পারেন।’ জবাবে বোস্টার জানান বিদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া তাদের স্বাভাবিক কোন রীতি নয়। তবে, তিনি ওয়াশিংটনে যোগাযোগ করে জানাবেন। এ সময় চাষী জানান সময় খুব কম। বোস্টার তখন সময়সীমা জানতে চান। চাষী বলেন, ৩ নভেম্বর  সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিট ওয়াশিংটন সময়। পাঁচ মিনিট পর মাহবুবুল আলম চাষী আবারো বোস্টারকে ফোন করে জানান খালেদ মোশারফের বাহিনীর সাথে সমঝোতার চেষ্টা হচ্ছে। ঐ সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে। বোস্টার চাষীর কাছে জানতে চান  তিনি আর কোন শক্তিধর দেশকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন কিনা। চাষী নেতিবাচক জবাব দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্টের (মোশতাক) সরকারের প্রতি অতীতে আপনাদের সহানুভূতির বিবেচনায় আপনাদেরকেই এ বিষয়ে অনুরোধ করা যাচ্ছে, অন্য কাউকে নয়। অন্য প্রান্ত থেকে বোস্টার জানান , সময়তো খুবই কম। বোস্টার তখনও ওয়াশিংটন থেকে কিসিঞ্জারের জবাবের জন্য অপেক্ষায় আছেন। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দেশ ত্যাগ করেন। বোস্টার চাষীকে ফোন করে জানতে চাইলেন মেজরদের দেশ ত্যাগের পর  আর আমেরিকায় আশ্রয় দেয়ার ঐ অনুরোধ  বহাল আছে কিনা। চাষী বলেন, প্রেসিডেন্টের বিষয়টি বহাল আছে। নির্ভর করবে ‘যারা দেশ শাসন করবে’ তাদের সঙ্গে সমঝোতার উপর। বোস্টার এই বিষয়টি একটু বুঝতে চাইলেন। চাষী বলেন, তিনি এর বেশি কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই।

মোশতাকের আশ্রয় বিষয়ে অবশেষে কিসিঞ্জারের কাছ থেকে জবাব পান বোস্টার। কিসিঞ্জার বোস্টারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট মোশতাককে আপনি আশ্বস্ত করেন যে, আমেরিকার সরকার তার ব্যক্তিগত  কল্যাণের বিষয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে। আমরা খুশি হয়েছি যে, সঙ্কটের সমঝোতা হযেছে এবং রক্তপাত এড়ানো গেছে। আপনি তাকে বলতে পারেন যে, তিনি আমেরিকায় আসতে চাইলে তাকে স্বাগত জানানো হবে। আপনি ইচ্ছা করলে বলতে পারেন যে, তার জীবনের যদি আশু বিপদ থাকে তাহলে তাকে আমাদের দূতাবাসে সাময়িক আশ্রয় দেয়ার প্রস্তুতি নেব।’

এর আগে ৩ নভেম্বর দিনের প্রথমভাগেই খালেদ মোশারফের বিরুদ্ধে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সাহায্য চান প্রেসিডেন্ট মোশতাক। তিনি সকাল ৮টা ১০ মিনিটে আমেরিকান রাস্ট্রদূতকে ফোন করে বলেন, খালেদ মোশারফ সমস্যা তৈরী করেছে। রাষ্ট্রদূত বোস্টার জানতে চান খালেদ মোশারফ সফল হয়েছে কিনা। প্রেসিডেন্ট তাকে জানান, মোশারফ সেনা প্রধান হতে চান এবং আরো দু-তিনটি বিষয়ে দাবি আছে তার। এ নিয়ে কথা বলার জন্য মোশতাক তাকে আসতে বলেছিলেন কিন্তু মোশারফ তাতে রাজি না হয়ে মিগ যুদ্ধ বিমান আকাশে উড়িয়ে তার শক্তি প্রদর্শন করছেন। এ নিয়ে বি জেড খসরু লিখেন, খালেদ মোশারফের সমর্থনকারীরা খুব দ্রুত ক্যন্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। তারা তখন একটি রাশিয়ান মিগ যুদ্ধবিমান ও অস্ত্রধারী একটি হেলিকপ্টার সারা শহরে উড়িয়ে শক্তি প্রদর্শন করতে থাকে। এ অবস্থায় মোশতাক কুমিল্লা কেন্টনমেন্টের সেনা বাহিনীর সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন।

আর এই উত্তপ্ত অবস্থার মাঝে আওয়ামী লীগে মোশতাকের শত্রু বলে পরিচিত জাতীয় চার নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী কামরুজ্জামান জেলখানায় নিহত হন। যা প্রকাশ হয় অনেক পরে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনী  মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে  জেলখানার ঘটনা নিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরপরই জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনাটি এমনভাবে নেয়া হয়েছিল পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার সাথে সাথে যাতে আপনা আপনি এটি কার্যকর হয়। আর এ কাজের জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি ঘাতক দলও গঠন করা হয়। এই ঘাতক দলের প্রতি নির্দেশ ছিল পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার সাথে সাথে কোন নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তারা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করবে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী সভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি বরখাস্তকৃত কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান এবং এবং বরখাস্ত লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ এ পরিকল্পনা করে। সূত্র : বাসস

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email