Skip to content

আদিবাসী নারীর লড়াই

আদিবাসী নারীর লড়াই

মুইসাথুই মার্মার বয়স ৫৬ বছর। এই বয়সেও পুরুষের সমান কাজ করেন। সদর উপজেলার লেমুঝিড়ি পাড়ায় তার বসবাস। ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি থাকার পরও নিজের কাজ ছাড়া বাড়তি আয়ের জন্য দিনমজুরি করেন। তাকে প্রায় বৃদ্ধ বলাই যায়। এই বয়সে তাকে নাতি-নাতনির সঙ্গে হাসি-খুশিতে থাকার কথা। সেখানে বেঁচে থাকার জন্য নিত্য কায়িক পরিশ্রম করে যেতে হচ্ছে তাকে। পুরুষের সমান শ্রম দেওয়ার পরও সমান মজুরি থেকে বঞ্চিত। তার মতো অন্য আদিবাসী নারীদের চিত্রও একই ধরনের। তবে শ্রমের মজুরির দিক থেকে শহর ও দুর্গম এলাকার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পাহাড়ের দুর্গম এলাকার নারীদের চেয়ে শহরের নারীরা কিছুটা বেশি পান। সকাল থেকে বিকেল অবধি আদিবাসী নারীরা বাড়িতে হোক আর জুমে; পরিশ্রম করেই যান। জুমে কাজ করার পরও বাড়িতে এসে নারীকেই রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বাড়ির সব কাজ তাকে সামলাতে হয়। আদিবাসী পুরুষরা সেই দিক থেকে নারীদের মতো তেমন শ্রম দেন না। জুমে জঙ্গল কাটা থেকে পরিস্কার, শস্য বীজ রোপণ, সংগ্রহ- সব কাজে পুরুষের চেয়ে বেশি শ্রম দিয়ে যান। দিনমজুর হিসেবে কোথাও কাজ করলে পুরুষের সমান শ্রমের মূল্য পান না। শহরের কাছাকাছি এলাকায় নারী শ্রমিকরা দিনে ২৫০-৩০০ টাকা আর পুরুষ পান ৫০০-৬০০ টাকা। অথচ পুরুষের সমান কিংবা কাছাকাছি শ্রম দেওয়ার পরও নারীর শ্রমে উপেক্ষিত থাকে। শহর থেকে দূরবর্তী দুর্গম এলাকায় নারী শ্রমিকরা দিনে মজুরি পান ২০০-২৫০ টাকা; আর পুরুষরা পান ৪০০-৫০০ টাকা।

পাহাড়ে নারী-পুরুষের মধ্যে শ্রমের মূল্য বিভাজন যুগ যুগ ধরে চলমান। তিন পার্বত্য এলাকার আদিবাসী নারীদের শ্রমের মূল্য বলা যায় একই ধরনের। নারীরা যে শ্রম দিয়ে যান সেই মূল্য টাকার অঙ্কে হিসাব করলে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি পাওয়ার কথা। নারী শ্রমকে সব সময় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে এ অঞ্চলে। জীবন-যাপন, দৈনন্দিন কাজ, জুম ও বাড়ির কাজে পাহাড়ের আদিবাসী নারীরা বেশি পরিশ্রম করে থাকেন। সদর উপজেলা টংকাবতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা কাইপো ম্রো (৩২)। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় তার জীবন। সকালে রান্না করে সেই খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জুমে যান। দুপুরে এসে আবার রান্না করতে হয় পরিবারের সদস্যদের জন্য। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার চলে যান জুমে। জুমের কাজ শেষ করে আবার রান্নাবান্নার কাজে মনোযোগ দিতে হয়। ছোট ছোট বাচ্চাও সামলাতে হয়। গরু-ছাগল, মুরগি, শূকরদের খাবার দিতে হয়। এর পরও মাঝেমধ্যে অন্যের কাছে দিনমজুরি করতে হয়। দিনে মজুরি হিসেবে তিনি পান ২০০ টাকা। অথচ পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম কাজ করেন না। একই ধরনের কাজ করে ল্ফ্রো সম্প্রদায়ের পুরুষ দিনমজুররা পান ৫০০ টাকা।

মানবাধিকার নেত্রী ও অনন্যা কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডনাই প্রু নেলী বলেন, ‘আমার মায়েরা, আমার বোনেরা আদিবাসী পুরুষের চাইতে কম কাজ করেন না। বরং বেশি শ্রম দিয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। আমরা নারীদের শ্রমকে মূল্যায়ন করি না।’ পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি রক্ষা অধিকার আন্দোলনের জেলা শাখার আহ্বায়ক জোয়াম লিয়ান আমলাই বলেন, ‘পাহাড়ে নারীদের শ্রমে জীবনের চাকা ঘোরে। আদিবাসী নারীদের শ্রমে পাহাড় হয়ে ওঠে সজীব। সেই সজীবতাকে পুরুষরা মূল্যায়ন করতে জানে না। পাহাড়কে আরও সজীব করে তুলতে নারীদের শ্রমের মূল্য দিতে হবে।’ া



বার্তা সূত্র