Skip to content

অরণ্যবিনাশী আয়োজন ও স্থানীয় প্রতিরোধ

অরণ্যবিনাশী আয়োজন ও স্থানীয় প্রতিরোধ

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬,৫০,১৫৯ জন এবং জাতিসত্তা ৫০টি। দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.২ ভাগ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ২০১৮ সালে শেষে হওয়া ভাষাগত জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসীদের ৪০টি মাতৃভাষা আছে। এর ভেতর কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা, মুন্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও লালেং এই ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষা বিপন্ন। আদিবাসী জাতির জীবনধারায় প্রাকৃতিক বনভূমি অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে আছে। অনেক আদিবাসী নাগরিক নিজেদের বনভূমির সন্তান মনে করেন। আদিবাসী জনগণ বনবাস্তুসংস্থানের অংশ। আদিবাসী জনগণ নিজেদের বনের নিয়ন্ত্রক বা শাসক মনে করেন না, মনে করেন এর ব্যবস্থাপক। বনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আদিবাসী মনোজগত, নিজস্ব পরিসর, রীতি, আচার, কৃত্য, ধর্ম, আপন সত্তা ও বৈভব, সাহিত্য, লোকায়ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতি। আদিবাসী জনগণ এবং বনভূমি অভিন্ন যমজ। এদের জোর করে আলাদা করা যায় কিন্তু আলাদা করলে এরা কেউ আলাদাভাবে স্বকীয় সত্তা নিয়ে বাঁচতে পারে না। প্রায় সকল আদিবাসী জাতিরই রয়েছে নিজস্ব লোকায়ত বনবিজ্ঞান ও বনপ্রতিবেশীয় অভিজ্ঞতা। আদিবাসীদের পবিত্র বৃক্ষ, পবিত্র প্রাণবৈচিত্র্য, পবিত্র বনভূমি ও পবিত্র জলাভূমি সংরক্ষণ চর্চার ধারা আছে। খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা, কৃত্য, আচার, পার্বণ, গৃহস্থালীসহ দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই বনের উপর নির্ভরশীল। আদিবাসী জনগণ বনকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেন না। বনকে কেনাবেচা করা যায় এমন বাণিজ্যিক পণ্য মনে করেন না। বনভূমিকে কেবলমাত্র বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিবেচনা করেন না। খাদ্য ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য আদিবাসীসহ স্থানীয় মানুষ বনের উপর নির্ভরশীল হলেও ইউরোপীয় রেকর্ড থেকে বনভূমি বাণিজ্যিকায়নের এক দুর্ধর্ষ কীর্তি জানা যায়। ১৭৭৮ সালে ক্যাপ্টেন জেমস কুক তার বাণিজ্য জাহাজ মেরামত করাতেন উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার নুটকা সাউন্ড অঞ্চলে। জাহাজ মেরামতের জন্য তখন বনভূমির বৃক্ষের কাঠ ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে ভ্যানকুভার দ্বীপ থেকে কাঠের তৈরি জাহাজের স্পার চীনে বিক্রি করাই এক লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়। এটি ১৮০০ শতক পর্যন্ত বনভূমিকেন্দ্রিক এক প্রধান বাণিজ্যে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কেবলমাত্র জাহাজ নয় উপনিবেশিক শাসকদের দুর্গও তৈরি হতে থাকে কাঠ দিয়ে। বাড়তে থাকে কাঠের বাণিজ্য এবং বনের বাণিজ্যিকায়ণ। এই বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতেই এশীয় অঞ্চলের বনভূমির উপর তৈরি হয় ব্রিটিশ উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ। অরণ্যের গিলা-কলিজা তছনছ করে শুরু হয় এক প্রশ্নহীন উপনিবেশিক বন-বাণিজ্য।

ব্রিটিশ, ভারত, পাকিস্তান সব আমল শেষ হয়ে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও বনবিভাগ সেই উপনিবেশিক মনস্তত্ত্বকেই ধারণ করে রেখেছে। বনভূমি এখনো কেবলই বাণিজ্যের কাঁচামালের উৎস আর মুনাফার নিরাপদ জোগানদার। বন-বাণিজ্য সামলাতে গিয়ে ‘সংরক্ষণ’, পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গোছের কিছু কর্মসূচিও জারি রাখা হয়েছে। জাতীয় উদ্যান, অবকাশ যাপন কেন্দ্র, করপোরেট পর্যটন, ইকোপার্ক, ইকোট্যুরিজম, তেল-গ্যাস খনন, শিল্পকারখানা স্থাপন, সামাজিক বনায়ন, রাবার বাগান, আগ্রাসী গাছের বাগান ইত্যকার প্রকল্প এবং উদ্যোগসমূহ বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এইসব প্রকল্প জোর করে বনের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসী জীবনের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং এসব প্রকল্পভিত্তিক তৎপরতা প্রাকৃতিক বনবৈচিত্র্যের প্রতিবেশগত সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু অরণ্য, প্রতিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান সুরক্ষায় আদিবাসী জনগণের লড়াই সংগ্রাম ঐতিহাসিক। আজকে এশীয় হাতি সুরক্ষায় বিশ্ব তৎপর হয়েছে। অথচ আজ থেকে দেড়শ বছর আগে নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরে হাতি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে হাজং আদিবাসীরা শুরু করেছিলেন ‘হাতিখেদা বিরোধী আন্দোলন’। সিলেট সীমান্তে খাসিরা পাথর খননের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ জুলুম সামলে দাঁড়ান। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে বালিশিরা পাহাড় রক্ষায় জীবন দেয় গ্রামীণ নিম্নবর্গ। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পাহাড়-জঙ্গল-বসতি বাঁচাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হয় দীর্ঘ সংগ্রাম। এককালে খর্জুর গাছ বাঁচাতে রাজার কুড়ালের কোপে প্রাণ দিয়েছিলেন অমৃতা দেবী। বাংলাদেশে মধুপুর শালবন রক্ষায় রাষ্ট্রের গুলিতে শহীদ হন পীরেন স্নাল। নেত্রকোণার মেনকিফান্দা পাহাড়ের শালবন বাঁচাতে জেলজুলুম সহ্য করেন অজিত রিছিল। রাষ্ট্র আদিবাসী জনগণের অরণ্য-যন্ত্রণা বুঝতে চায়নি। অরণ্য সুরক্ষায় আদিবাসীদের ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকৃতি দেয়নি। অরণ্য ঘিরে রাষ্ট্রের প্রকল্পভিত্তিক বাণিজ্যিক মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে তাই জাগ্রত আছে আদিবাসী অরণ্য-সংগ্রাম। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর টগবগে ময়দানে দাঁড়িয়ে আজ আমরা কী দেখছি? দেশের অরণ্য, প্রাণবৈচিত্র্য আর জলাভূমির কী অবস্থা? এর জন্য দায়ী কে? দায়ী আমাদের অরণ্যবিচ্ছন্ন উপনিবেশিক বাণিজ্যিক মনস্তত্ত্ব। এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নাই। অরণ্য সুরক্ষায় আদিবাসী জ্ঞান ও সংগ্রামকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও তৎপরতায় যুক্ত করা জরুরি। চলতি আলাপখানি স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা আদিবাসী নিম্নবর্গের অরণ্য ও পরিবেশ সংগ্রাম ঘিরে। প্রতি বছর ২১ মার্চ পালিত হয় বিশ্ব বন দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘অরণ্য ও উদ্ভাবন’। দেশের মুমূর্ষু নিপীড়িত অরণ্যরেখা সুরক্ষায় বন নিয়ে আমাদের উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে পারে সবথেকে কার্যকর উদ্ভাবন। বনবাসী মানুষের অরণ্যজ্ঞান ও লোকায়ত সংরক্ষণ চর্চার স্বীকৃতি ও সুরক্ষা হতে পারে উদ্ভাবনী গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা।

বার্তা সূত্র